কিলিং জোনে পরিণত ‘টিলাগড়’

বিশেষ প্রতিবেদক :: একের পর এক হত্যাকান্ড আর সংঘর্ষের কারণে ‘কিলিং জোন’ হিসেবে পরিচিতি দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে সিলেট নগরের টিলাগড়। ওই এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ এমসি কলেজ, সিলেট সরকারি কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যায়নরত প্রায় ৪০-৪৫ হাজার শিক্ষার্থীদের মেস বাড়ি রয়েছে টিলাগড়ের বিভিন্ন মহল্লায়। বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীরা টিলাগড়ে বসবাস করায় ওই এলাকায় ছাত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্য পূর্বকা থেকে বহমান।

টিলাগড় এলাকায় সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুটির প্রভাবশালী বলয় রয়েছে। একটির নিয়ন্ত্রণ করেন আজাদ ও অপরটির রণজিৎ। আজাদ গ্রুপ ও রণজিৎ গ্রুপ নামে দুটি বলয় পরিচিত। আজাদ গ্রুপের প্রধান
আজাদুর রহমান আজাদ। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের একাধিকবারের কাউন্সিলর ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। আর রণজিৎ গ্রুপের প্রধান অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার। তিনি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক।

দীর্ঘদিন থেকে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুইপদের একটি এই দুইগ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি এখানকার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও রয়েছে দুই বলয়ের আধিপত্য। এছাড়াও সংগঠনটির সাবেক ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের একাধিক উপ-গ্রুপ রয়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষ হচ্ছে তাদের মধ্যে। ফলে উদ্বিঘ্ন স্থানীয় জনসাধারণ।

জানা যায়, টিলাগড় এলাকায় প্রায়ই রাজনৈতিক সংঘর্ষে খুনের ঘটনা প্রায় প্রতি বছরও ঘটে থাকে। পুরো সিলেট নগরে হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষ হয় তার চেয়ে বেশি হয় এই এলাকায়।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০ বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে টিলাগড় এলাকায় কমপক্ষে ৪০টির বেশি সংঘর্ষ হয়েছে।

প্রতিটিতেই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে অবৈধ এসব অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের দৃশ্যমান তেমন কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অপরাধীরা দিন দিন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বেড়েছে খুনের মত লোমহর্ষক ঘটনা।

একটি সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসারে জানা গেছে, প্রভাব বিস্তার, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা কারণে এ এলাকায় একের পর এক হত্যাকা- ঘটছে। টিলাগড় এলাকায় সাতটি চক্রের কাছে অবৈধ এসব অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটিই ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার শেল্টারে রয়েছে। বাকি দুটি বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। অবৈধ অস্ত্রের জোগান মূলত সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আসে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে সরস্বতী পূজা আয়োজনের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দু’পক্ষের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় ছাত্রলীগকর্মী অভিষেক দে (১৮)। এ ঘটনায় আরেক ছাত্রলীগ শুভ (১৮) আহত হয়েছেন।

রাত সাড়ে নয়টার দিকে টিলাগড় মোড়ের গোপালটিলা এলাকায় খুনের এ ঘটনা ঘটে। অভিষেক গ্রিন হিল কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। সে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রণজিৎ সরকারের অনুসারি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সরস্বতী পূজা আয়োজনের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি অভিষেক ও তার বন্ধু শুভর সঙ্গে একই এলাকার কয়েক তরুণের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা মীমাংসা করে দেন। তবে গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে গোপালটিলা এলাকায় অভিষেক ও শুভকে ছুরিকাঘাত করে অভিযুক্ত তরুণরা।

পরে স্থানীয়রা তাদেরকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক অভিষেককে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাতেই সৈকত রায় সমুদ্র নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। সে সিলেট জেলা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সহসভাপতি। টিলাগড়ে খুনের রাজনীতি ২০০৩ সাল থেকে শুরু হয়ে আজ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

সিলেট মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পরিতোষ ঘোষ জানিয়েছেন, এই এলাকায় মূলত সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা ঘটে। অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে তিনি বলেন, কারা এসব অস্ত্রের মজুদ রাখছে তাদের ব্যাপারে আমাদের কাছে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপারে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের অপশনে ক্লিক করুন

এ জাতীয় আরও সংবাদ :




Facebook Page


Scroll Up